গাড়ি কেনার জন্য ঋণ, কোন ব্যাংকের কী সুবিধা।
চাইলেই হুট করে গাড়ি কেনা সম্ভব হয়ে ওঠে না। গাড়ি কেনা, রক্ষণাবেক্ষণ করা, সার্ভিসিং করা, সব মিলিয়ে বিশাল অঙ্কের খরচের বোঝা যুক্ত হয় মাথায়। তবে নামমাত্র ইন্টারেস্টে বিভিন্ন ব্যাংক পূরণ করতে সাহায্য করবে আপনার স্বপ্ন। সহজ শর্ত ও প্রতিযোগিতামূলক সুদহার নিশ্চিত করতে পারায় ঋণ করে গাড়ি কেনা সচ্ছল গ্রাহকদের হাতের মুঠোয়।
গাড়ি ক্রয় করার জন্য সবচেয়ে নিরাপদ লোন হচ্ছে কার লোন বা গাড়ির ঋণ। এই লোন নেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত কোনো জিনিসপত্র ব্যাংকের কাছে বন্ধক রাখতে হয় না। কিছু কিছু ব্যাংকে আলাদা করে ডিপোজিটেরও প্রয়োজন হয় না। বরং ঋণের টাকা দিয়ে কেনা গাড়ির মালিকানা বণ্টন হয় ব্যাংক ও ঋণগ্রহীতার মাঝে।
যেহেতু আলাদা করে কোনো কিছু বন্ধক রাখতে হয় না, সেহেতু ঋণগ্রহীতার বর্তমান আর্থিক অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েই কার লোন দেয় ব্যাংকগুলো। চাকরিজীবী হলে তার চাকুরির অবস্থা, বেতন ইত্যাদি বিবেচনা করে। অন্য দিকে ব্যবসায়ী হলে তার ব্যবসার অবস্থা বিবেচনা করে বা অন্য পেশাজীবী হলে তার আয়ের অবস্থা বিবেচনা করে ডকুমেন্টস প্রয়োজন হয়।

তবে চাকরিজীবীর তুলনায় ব্যবসায়ীদের সঞ্চয় ও মাসিক আয় বেশি হলে কার লোন মেলে সহজে। ব্যাংকভেদে এই অর্থের পরিমাণ ওঠানামা করে। টিন, ট্যাক্স সার্টিফিকেট, চাকরিজীবী হলে চাকরির সনদপত্র, ব্যবসায়ী হলে ট্রেড লাইসেন্স; ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র ছাড়া কার লোন নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না।
এই বছরের শুরুতে অটো লোনের ক্ষেত্রে বেশ কিছু নিয়মাবলি শিথিল করেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এর আগে সর্বোচ্চ ৪০ লাখ টাকা কার লোন দেওয়া যেত, যা বাড়িয়ে করা হয়েছে ৬০ লাখ টাকা। এ ছাড়া বৈদ্যুতিক গাড়ির প্রচলন বাড়াতে হাইব্রিড ও বৈদ্যুতিক গাড়ির জন্য ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বছরের শুরুতে এক প্রজ্ঞাপনে এই নির্দেশনা দিয়েছে। তবে পুরোনো গাড়ির ক্ষেত্রে ঋণ ও শতাংশের পরিমাণ অনেকটা কমে আসে। তবে ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে এই নিয়ম থাকলেও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এর বাইরে।
বর্তমানে বেশ কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বেশ কম ইন্টারেস্টে অটো লোন দিচ্ছে। এর মধ্যে এগিয়ে আছে আইপিডিসি, আইডিএলসি ও লঙ্কাবাংলা। এ ছাড়া ব্যাংকগুলোর মধ্যে পূবালী, ব্র্যাক, সিটি, ঢাকা, ডাচ্‌–বাংলা, প্রিমিয়ার ও ইস্টার্ন ব্যাংক গাড়িঋণের শীর্ষে আছে। কিছু কিছু ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এখন নিজেরাই গাড়ি বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হচ্ছে। সহজ শর্তে ঋণ দেওয়া ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অটো লোনগুলো দেখে নেওয়া যাক একনজরে।

 

পূবালী ব্যাংক
৫ লাখ টাকা থেকে শুরু করে ৬০ লাখ টাকা পর্যন্ত অটো লোন দিচ্ছে পূবালী ব্যাংক। তারা গাড়ির মোট অর্থের ৭০ শতাংশ লোন দিচ্ছে, হাইব্রিড গাড়িতে ৭০ শতাংশ এবং ৬০ শতাংশ লোন দিচ্ছে নন হাইব্রিড গাড়িতে। ১ থেকে ৫ বছর মেয়াদি ঋণ দেয় ব্যাংকটি। ব্যাংটির ১৪ শতাংশ ইন্টারেস্টে রেট ও ০.৫% সুপারভিশন চার্জ এবং সুপারভিশন চার্জের উপর ১৫% ভ্যাট, এছাড়া রয়েছে স্টাম্প চার্জ।
যেকোন গ্রহক সহজেই তাদের এজেন্ট ব্যাংকের মাধ্যমে, কনজুমার ক্রেডিট স্কিম এর কার লোন নিতে পারেন।
পূবালী ব্যাংক সুদ ভিত্তিক লোন দিলেও তাদের বেশকিছু শাখায় ইসলামি উইন্ডোরোর মাধ্যমে, ইসলামি মুনাফা ভিত্তিক কার লোন দেয়।

সিটি ব্যাংক
৪ লাখ টাকা থেকে শুরু করে ৬০ লাখ টাকা পর্যন্ত অটো লোন দিচ্ছে ব্যাংকটি। প্রয়োজনে অটো লোনের সাথে পারসোনাল লোন দিচ্ছে ব্যাংটি। গাড়ির মোট অর্থের ৭০ শতাংশ লোন হিসেবে দিচ্ছে তারা। ১ থেকে ৬ বছর মেয়াদি ঋণ পেতে চাইলে চাকরিজীবীদের মাসিক আয় হতে হবে অন্তত ৪০ হাজার টাকা। ব্যবসায়ী ও অন্যান্য পেশাজীবীদের ক্ষেত্রে ৬০ হাজার টাকা আয় হতে হবে। সুদ ভিত্তিক ও ইসলামি মুনাফা ভিত্তিক উভয় ভাবে অটো লোন দেয় সিটি ব্যাংক।
ব্যাংটির ১৩ শতাংশ ইন্টারেস্টে ও ০.৫% সুপারভিশন চার্জ এবং সুপারভিশন চার্জের উপর ১৫% ভ্যাট, এছাড়া রয়েছে স্টাম্প চার্জ।

ব্র্যাক ব্যাংক
৬০ লাখ টাকা পর্যন্ত অটো লোন দিচ্ছে ব্র্যাক ব্যাংক। তবে ১ শতাংশ প্রসেসিং ফি দিয়ে ঋণ গ্রহণ করতে হবে গ্রহীতাদের। ২৫ থেকে ৬৫ বছর বয়সী যে কেউ গ্রহণ করতে পারবেন এই অটো লোন৷ চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে মাসিক আয় হতে হবে ২৫ হাজার টাকা। অন্যান্যদের ক্ষেত্রে ৩৫ হাজার টাকা। তবে সরকার নির্ধারিত ইন্টারেস্ট রেটের কারণে প্রতি ছয় মাস পরপর তাদের ইন্টারেস্ট রেট পরিবর্তন হতে পারে।

ঢাকা ব্যাংক
১১ শতাংশ ইন্টারেস্ট রেটে অটো লোন দিচ্ছে ঢাকা ব্যাংক, তবে সরকার নির্ধারিত ইন্টারেস্ট রেটের কারণে প্রতি ছয় মাস পরপর তাদের ইন্টারেস্ট রেট পরিবর্তন হতে পারে। ৬০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারবে শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ প্রসেসিং ফি দিয়ে। ২৫ বছরের ওপরে যে কেউ নিতে পারবেন কার লোন।

প্রিমিয়ার ব্যাংক
৫ লাখ টাকা থেকে শুরু করে ৬০ লাখ টাকা পর্যন্ত অটো লোন দিচ্ছে প্রিমিয়ার ব্যাংক। গাড়ির মোট অর্থের ৭০ শতাংশ লোন হিসেবে দিচ্ছে তারা। ১ থেকে ৫ বছর মেয়াদি ঋণ পেতে চাইলে চাকরিজীবীদের মাসিক আয় হতে হবে অন্তত ৪০ হাজার টাকা। ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে ৬০ হাজার টাকা। ১৮ শতাংশ ইন্টারেস্টে রেট এবং রয়েছে আলাদা প্রসেসিং ফি।

এনআরবি ব্যাংক
এনআরবি ব্যাংক গাড়ির মোট অর্থের ৭০ শতাংশ লোন দিচ্ছে হাইব্রিড গাড়িতে এবং নন হাইব্রিড গাড়িতে ৬০ শতাংশ এছাড়া ৫০ শতাংশ লোন দিচ্ছে (২০১৭ সাল পর্যন্ত) পুরাতন গাড়িতে । ১ থেকে ৬ বছর মেয়াদি ঋণ দেয় ব্যাংকটি। ব্যাংটির ১১.৯৯ শতাংশ ইন্টারেস্টে রেট ও ০.৫% সুপারভিশন চার্জ এবং সুপারভিশন চার্জের উপর ১৫% ভ্যাট, এছাড়া রয়েছে স্টাম্প চার্জ।

ইস্টার্ন ব্যাংক
সাড়ে ৩ লাখ থেকে শুরু করে ৬০ লাখ টাকা পর্যন্ত কার লোন দিচ্ছে ইস্টার্ন ব্যাংক। গাড়ির প্রায় ৬০ শতাংশ ঋণ হিসেবে দেয় তারা। বাকিটুকু ক্রেতার নিজের বহন করতে হয়। ২২ থেকে ৬৫ বছর বয়সী যে কেউ আবেদন করতে পারবেন। তবে তাঁদের মাসিক আয় হতে হবে অন্তত ৫০ হাজার টাকার বেশি। ১ থেকে ৫ বছর মেয়াদি ঋণ পেতে ইন্টারেস্ট দিতে হবে ১৩% ও ০.৫% সুপারভিশন চার্জ এবং সুপারভিশন চার্জের উপর ১৫% ভ্যাট, এছাড়া রয়েছে স্টাম্প চার্জ।

ডাচ্‌–বাংলা ব্যাংক
১৮ বছরের ওপরে যে কারও জন্য প্রস্তুত আছে ডাচ্‌–বাংলা ব্যাংকের কার লোন। সর্বোচ্চ ৬০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ নেওয়া যাবে এই কার লোন থেকে। চাকরিজীবীদের জন্য মাসিক ২৫ হাজার ও অন্যান্য পেশাজীবীদের জন্য মাসিক ৫০ হাজার টাকা আয় প্রয়োজন এই ঋণের অন্তর্ভুক্ত হতে। সর্বোচ্চ ৫ বছরের জন্য ঋণ দিচ্ছে তারা। ঋণ পেতে দিতে হবে স্টাম্প ও সুপারভিশন চার্জ।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক
৫ লাখ টাকা থেকে শুরু করে ৬০ লাখ টাকা পর্যন্ত অটো লোন দিচ্ছে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক। গাড়ির মোট অর্থের ৭০ শতাংশ লোন হিসেবে দিচ্ছে তারা। ১ থেকে ৬ বছর মেয়াদি ঋণ পেতে চাইলে চাকরিজীবীদের মাসিক আয় হতে হবে অন্তত ৪০ হাজার টাকা। ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে ৬০ হাজার টাকা। ১৪ শতাংশ ইন্টারেস্ট এবং ঋণ পেতে দিতে হবে স্টাম্প ও সুপারভিশন চার্জ।

এবি ব্যাংক
৫ লাখ টাকা থেকে শুরু করে ৬০ লাখ টাকা পর্যন্ত অটো লোন দিচ্ছে এবি ব্যাংক। গাড়ির মোট অর্থের ৭০ শতাংশ লোন হিসেবে দিচ্ছে তারা। ১ থেকে ৬ বছর মেয়াদি ঋণ পেতে চাইলে চাকরিজীবীদের মাসিক আয় হতে হবে অন্তত ৪০ হাজার টাকা। ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে ৬০ হাজার টাকা। ১২ শতাংশ ইন্টারেস্টে লাগবে না কোনো আলাদা ফি।

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ
৫ লাখ টাকা থেকে শুরু করে ৬০ লাখ টাকা পর্যন্ত অটো লোন দিচ্ছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ গাড়ির মোট অর্থের ৭০ শতাংশ লোন হিসেবে দিচ্ছে তারা। ১ থেকে ৬ বছর মেয়াদি ঋণ পেতে চাইলে চাকরিজীবীদের মাসিক আয় হতে হবে অন্তত ৪০ হাজার টাকা। ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে ৬০ হাজার টাকা। ১৪ শতাংশ মুনাফায় ঋণ পেতে দিতে হবে স্টাম্প ও সুপারভিশন চার্জ।

স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক
৪ লাখ টাকা থেকে শুরু করে ৬০ লাখ টাকা পর্যন্ত অটো লোন দিচ্ছে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক। গাড়ির মোট অর্থের ৭০ শতাংশ লোন হিসেবে দিচ্ছে তারা। ১ থেকে ৬ বছর মেয়াদি ঋণ পেতে চাইলে চাকরিজীবীদের মাসিক আয় হতে হবে অন্তত ৪০ হাজার টাকা। ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে ৬০ হাজার টাকা। ১৪ শতাংশ ইন্টারেস্টে, ঋণ পেতে দিতে হবে স্টাম্প ও সুপারভিশন চার্জ।

লংকা বাংলা ফাইন্যান্স
গাড়ির মোট অর্থের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ লোন হিসেবে দিচ্ছে তারা। ১ থেকে ৫ বছর মেয়াদি ঋণ পেতে চাইলে চাকরিজীবীদের মাসিক আয় হতে হবে অন্তত ৬০ হাজার টাকা। ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে ৯০ হাজার টাকা। ১৩ শতাংশ ইন্টারেস্টে, ঋণ পেতে দিতে হবে স্টাম্প ও সুপারভিশন চার্জ।

আই ডি এল সি ফাইন্যান্স
গাড়ির মোট অর্থের ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ লোন হিসেবে দিচ্ছে তারা। ১ থেকে ৫ বছর মেয়াদি ঋণ পেতে চাইলে চাকরিজীবীদের মাসিক আয় হতে হবে অন্তত ৬০ হাজার টাকা। ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে ১,২০,০০০ হাজার টাকা। ১২.৭৫ শতাংশ ইন্টারেস্টে, ঋণ পেতে দিতে হবে স্টাম্প ও সুপারভিশন চার্জ।

ন্যাশনাল ফিন্যান্স
গাড়ির মোট অর্থের ৭০ শতাংশ লোন হিসেবে দিচ্ছে তারা। ঋনের মেয়াদ ১ থেকে ৫ বছর। ১৪ শতাংশ ইন্টারেস্টে, ঋণ পেতে দিতে হবে স্টাম্প ও সুপারভিশন চার্জ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *